
ইসরাইলকে আর্থিক সহায়তা বন্ধ করবে যুক্তরাষ্ট্র: ট্রাম্প
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬, ১:১৮

যুক্তরাষ্ট্রে স্থানীয় সময় ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে মধ্যবর্তী নির্বাচন। ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রের আইনসভা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ এবং প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের মেয়াদের শেষ দুই বছরের ক্ষমতার ভাগ্য নির্ধারণে আজ ৩ নভেম্বর (মঙ্গলবার) অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহুপ্রতীক্ষিত মধ্যবর্তী নির্বাচন। রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটিক–দুই শিবিরের জন্যই এই ভোট কেবল কংগ্রেসের আসন দখলের লড়াই নয়; এটি মূলত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম দুই বছরের কাজের ওপর ভোটারদের এক বড় ধরনের গণভোট।
মার্কিন প্রেসিডেন্টদের চার বছরের মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভার এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় বলে একে ‘মিডটার্ম’ বা মধ্যবর্তী নির্বাচন বলা হয়ে থাকে। দ্বিকক্ষবিশিষ্ট এই আইনসভা উচ্চকক্ষ সিনেট এবং নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদ নিয়ে গঠিত। কংগ্রেসের একটি প্রধান কাজ হলো ফেডারেল বা যুক্তরাষ্ট্রীয় আইন প্রণয়ন ও পাস করা, এমন আইন যা দেশব্যাপী প্রযোজ্য। এই নির্বাচনের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে ট্রাম্প তার অবশিষ্ট মেয়াদে নিজের পরিকল্পনাগুলো কতটা সহজে পাস করাতে পারবেন, নাকি প্রতিনিয়ত বিরোধী ডেমোক্র্যাটদের তোপের মুখে পড়বেন।
কংগ্রেসের দুটি কক্ষ–নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদ (হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভস) এবং উচ্চকক্ষ সিনেটে প্রতিনিধি পাঠাতে আজ দেশের হাজার হাজার কেন্দ্রে ভোট দেবেন মার্কিনিরা।
প্রতিনিধি পরিষদ: নিম্নকক্ষের মোট ৪৩৫টি আসনের সব কটিতেই লড়াই হচ্ছে। নির্বাচিত প্রার্থীরা দুই বছরের জন্য দায়িত্ব পালন করেন। যুক্তরাষ্ট্রে নতুন যে কোনো জাতীয় আইনের প্রস্তাব সাধারণত এখানেই প্রথম উত্থাপিত ও বিতর্কিত হয়।
সিনেট: ১০০ সদস্যের উচ্চকক্ষে এবার ৩৫টি আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সিনেটরদের মেয়াদ থাকে ছয় বছর। আইন চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া কিংবা আটকে দেয়ার ক্ষেত্রে সিনেটের ভূমিকা প্রধান।
অঙ্গরাজ্য পর্যায়ের ভোট: একই সঙ্গে ক্যালিফোর্নিয়া, ফ্লোরিডা, জর্জিয়া ও মিশিগানের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যগুলোর গভর্নরসহ স্থানীয় আইনসভার প্রার্থীদের বেছে নেবেন ভোটাররা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভোটারদের একটা বড় অংশের চিন্তাজুড়ে রয়েছে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি। দৈনন্দিন পণ্য সামগ্রী, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, আবাসন এবং স্বাস্থ্যসেবার চড়া মূল্য সাধারণ মানুষকে ভোগাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল ও ইরানের সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে সামগ্রিক মুদ্রাস্ফীতিতে। ইউএস ফেডারেল রিজার্ভ নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে এখনও উপরে রয়েছে মূল্যস্ফীতি। ডেমোক্র্যাটিক পার্টির অভিযোগ, ট্রাম্পের কঠোর শুল্কনীতির (ট্যারিফ) কারণেই সাধারণ ভোক্তাদের ওপর অতিরিক্ত দামের চাপ তৈরি হয়েছে।
অপরদিকে, সীমান্ত নিরাপত্তা ও অবৈধ অভিবাসনবিরোধী অভিযানকে নিজেদের প্রধান রাজনৈতিক সাফল্য হিসেবে প্রচার করছে রিপাবলিকান দল। তারা বলছে– সীমান্ত কঠোর করে এবং অবৈধ অভিবাসনের বিরুদ্ধে ব্যাপক ও প্রায়ই বিতর্কিত অভিযান শুরু করার মাধ্যমে ট্রাম্প ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারণার একটি বড় প্রতিশ্রুতি পূরণ করেছেন। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নিয়েও সাম্প্রতিক সপ্তাহে দুই শিবিরের নীতিগত বৈপরীত্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সরকার পরিচালনায় যে তিনটি মূল শাখা–প্রেসিডেন্ট, বিচার বিভাগ ও কংগ্রেস রয়েছে, তার মধ্যে আইনসভা কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে রিপাবলিকানরা। তবে তাদের এই সংখ্যাগরিষ্ঠতার পাল্লা অত্যন্ত পাতলা।
নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের মোট আসন সংখ্যা ৪৩৫টি। সেখানে এককভাবে দলীয় নিয়ন্ত্রণ বা সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য যে কোনো দলের ন্যূনতম ২১৮টি আসন প্রয়োজন। বর্তমানে রিপাবলিকানদের হাতে রয়েছে ২১৮টি আসন (যার মধ্যে একজন তাদের সমর্থক স্বতন্ত্র সদস্য অন্তর্ভুক্ত), আর বিরোধী ডেমোক্র্যাটদের ঝুলিতে রয়েছে ২১৬টি আসন। ফলে প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটরা সামান্য পিছিয়ে থাকলেও যে কোনো মুহূর্তেই শক্তির ভারসাম্য বদলে যেতে পারে।
অন্যদিকে, ১০০ আসনবিশিষ্ট উচ্চকক্ষ সিনেটে রিপাবলিকানদের দখলে রয়েছে ৫৩টি আসন এবং ডেমোক্র্যাটদের হাতে রয়েছে ৪৭টি আসন। নিয়ম অনুযায়ী, সিনেটে কোনো সিদ্ধান্ত বা বিলে ৫০-৫০ সমতা বা টাই তৈরি হলে সিদ্ধান্তসূচক নির্ণায়ক ভোট দেয়ার ক্ষমতা থাকে দেশের ভাইস প্রেসিডেন্টের। বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্ট রিপাবলিকান দলীয় হওয়ার কারণে ডেমোক্র্যাটদের জন্য উচ্চকক্ষের একক নিয়ন্ত্রণ পেতে হলে অন্তত ৫১টি আসনে জয় নিশ্চিত করতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ইতিহাস ও ঐতিহ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সাধারণ ভোটাররা মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতার শীর্ষে থাকা প্রেসিডেন্টের দলের প্রতি কিছুটা বিরূপ মনোভাব দেখান। এবারও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ওপর নাগরিকদের অসন্তোষ স্পষ্ট। জনমত জরিপ সংক্রান্ত জনপ্রিয় ওয়েবসাইট ‘সিলভার বুলেটিন’-এর তথ্যানুযায়ী, দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেয়ার সময় ট্রাম্পের জনসমর্থন ৫০ শতাংশের কিছু বেশি ছিল। তবে অক্টোবরের শুরুতেই তা কমে প্রায় ৩৭ শতাংশে নেমে আসে, যেখানে অন্তত ৬১ শতাংশ মার্কিনি তার কর্মকাণ্ডে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
তবে এই জনসমর্থনের হিসাবই ভোটের চূড়ান্ত ফল নয়, কারণ দুই কক্ষের প্রতিটি আসন সমভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয় না। অনেক আসনই ডেমোক্র্যাট বা রিপাবলিকানদের জন্য ‘নিরাপদ দুর্গ’ হিসেবে ধরা থাকে। বিবিসির মার্কিন সহযোগী সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পুরো দেশের মধ্যে বিশেষ কিছু রাজ্যের আসনই এবার মূল নির্ণায়ক হয়ে উঠবে। এর মধ্যে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণে আইওয়া ও নিউ হ্যাম্পশায়ারের মতো রাজ্যগুলোর ১০টি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসন এবং প্রতিনিধি পরিষদের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলাতে অ্যারিজোনা ও ওহাইওর ৪২টি আসনের ভোটের ওপর কড়া নজর রাখছেন বিশ্লেষকরা।
এ ছাড়া প্রতিনিধি পরিষদের ভোট এবার আরও বেশি জটিল ও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণ পদ্ধতি নিয়ে দুই দলের বিরোধের কারণে। নির্বাচনে বাড়তি সুবিধা পেতে রিপাবলিকানরা নিজেদের অনুকূলে কিছু রাজ্যের নির্বাচনী মানচিত্র বা সীমানা নতুন করে এঁকেছিল, যা পাল্টা কৌশল হিসেবে অনেক রাজ্যে ডেমোক্র্যাটরাও অনুসরণ করেছে। ফলে এই আসনগুলোতে জয়ের সমীকরণ মেলাতে কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়তে হচ্ছে দুই দলকেই।
যদি ডেমোক্র্যাটরা যে কোনো একটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পায়, তবে: ১. প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ওপর সংসদীয় নজরদারি বা তদারকি বাড়বে। ২. হোয়াইট হাউজের নতুন বলরুম সংস্কার কাজ, ইমিগ্রেশন ও কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই)-এর বিতর্কিত পদক্ষেপ এবং দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানে কংগ্রেস কমিটি গঠন করা সম্ভব হবে। ৩. ট্রাম্পকে পুনরায় অভিশংসন (ইমপিচমেন্ট) করার মতো রাজনৈতিক পদক্ষেপ নেয়ার সুযোগ তৈরি হবে ডেমোক্র্যাটদের সামনে।
পক্ষান্তরে, রিপাবলিকানরা পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারলে ট্রাম্পের জন্য আগামী দুবছর তার পছন্দের সব নীতি ও বাজেট সহজেই পাস করিয়ে নেয়ার পথ পরিষ্কার থাকবে।
যদিও এই মধ্যবর্তী নির্বাচনের ব্যালটে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নাম সরাসরি নেই, তা-ও তিনি সমর্থকদের প্রতি বিশেষ আহ্বান জানিয়েছেন। রিপাবলিকান ভোটারদের উদ্দেশে ট্রাম্প বলেছেন, তারা যেন এই ভোটকে তার এযাবৎকালের নীতি ও কর্মকাণ্ডের ওপর আস্থা প্রকাশের সুযোগ হিসেবে নেন এবং ব্যালটে তার নাম রয়েছে ধরে নিয়েই ভোটকেন্দ্রে যান।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ভাষ্যকারদের মতে, নির্বাচনের ফল যেদিকেই যাক না কেন, ডনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কোন পথে এগোচ্ছে–তা নিয়ে দেশটির আমজনতার আসল মনোভাব কী, তা নিরূপণে এই ফলকেই প্রধান মাপকাঠি হিসেবে ব্যবহার করা হবে।
মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির পক্ষে তৃতীয়বার প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ নেই। ফলে এই মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর্ব শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ২০২৮ সালের পরবর্তী মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে ঘিরে উভয় দলে নতুন জল্পনা-কল্পনা ও তোড়জোড় শুরু হয়ে যাবে। রিপাবলিকান পার্টিতে ট্রাম্পের উত্তরসূরি হিসেবে কে দলের নেতৃত্ব নেবেন এবং বিরোধী ডেমোক্র্যাটিক পার্টি থেকেই-বা ট্রাম্প শিবিরের বিরুদ্ধে কারা মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠবেন, তা নিয়ে আলোচনা এখন থেকেই গতি পাচ্ছে।
সূত্র: বিবিসি