
সৌদির দুই বিমানবন্দরে হুতিদের হামলায় নিহত ৩, আহত ৩৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ৬ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০৯

মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আর মাত্র চার সপ্তাহ বাকি। এই নির্বাচনে ভোটারদের দেওয়া রায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট হিসেবে বাকি মেয়াদের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
মধ্যবর্তী নির্বাচন কী?
আগামী ৩ নভেম্বর মার্কিন ভোটাররা তাদের পার্লামেন্ট কংগ্রেসের সদস্য নির্বাচন করবেন। কংগ্রেস দুটি কক্ষ নিয়ে গঠিত—প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট।
প্রতি দুই বছর পরপর কংগ্রেস নির্বাচন হয়। প্রেসিডেন্টের চার বছরের মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, সেটিই ‘মিডটার্ম’ বা মধ্যবর্তী নির্বাচন নামে পরিচিত।
কংগ্রেসের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো ফেডারেল আইন তৈরি ও পাস করা, অর্থাৎ যেসব আইন পুরো যুক্তরাষ্ট্রে প্রযোজ্য।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল নির্ধারণ করবে কোন রাজনৈতিক দল—ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি নাকি বিরোধী ডেমোক্র্যাটিক পার্টি—কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নেবে এবং প্রেসিডেন্টের নিজের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কতটা সহজ হবে।
এই ফলাফলকে যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ এখন পর্যন্ত প্রেসিডেন্টের কর্মকাণ্ডে কতটা সন্তুষ্ট, তারও একটি পরিমাপক হিসেবে দেখা হয়।
কারা নির্বাচিত হচ্ছেন?
কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের সব ৪৩৫টি আসনেই নির্বাচন হবে। সদস্যদের মেয়াদ নির্ধারিত দুই বছর। সাধারণত প্রতিনিধি পরিষদেই বিভিন্ন প্রস্তাবিত আইন উত্থাপন ও তা নিয়ে বিতর্ক হয়।
অন্যদিকে, কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেটের ১০০ আসনের মধ্যে ৩৫টিতেও নির্বাচন হবে। সিনেটরদের মেয়াদ ছয় বছর। অন্যান্য দায়িত্বের পাশাপাশি তারা প্রতিনিধি পরিষদ থেকে আসা প্রস্তাবিত আইন অনুমোদন বা আটকে দিতে পারেন।
একই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে রাজ্য পর্যায়ের রাজনীতিকদেরও নির্বাচন হবে। ক্যালিফোর্নিয়া, ফ্লোরিডা, জর্জিয়া ও মিশিগানের গভর্নর নির্বাচনগুলোর দিকে বিশেষ নজর থাকবে।
গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু কী?
অনেক ভোটারের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি বড় একটি উদ্বেগের বিষয়। জ্বালানি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, আবাসন ও স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় নিয়ে তারা চাপের মধ্যে রয়েছেন।
মুদ্রাস্ফীতি এখনো মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার ওপরে রয়েছে। এর পেছনে আংশিকভাবে ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানের সঙ্গে শুরু হওয়া যুদ্ধের প্রভাব রয়েছে।
ডেমোক্র্যাটরা বলছেন, ট্রাম্পের বাণিজ্য শুল্কের কর্মসূচিও যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের জন্য পণ্যের দাম বাড়িয়েছে।
অভিবাসনও গুরুত্বপূর্ণ একটি ইস্যু। রিপাবলিকানরা বলছে, ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারে দেওয়া বড় প্রতিশ্রুতির একটি ট্রাম্প বাস্তবায়ন করেছেন। তিনি সীমান্তে নিয়ন্ত্রণ কঠোর করেছেন এবং অবৈধ অভিবাসনের বিরুদ্ধে ব্যাপক, অনেক ক্ষেত্রে বিতর্কিত, অভিযান শুরু করেছেন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়েও সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে উদ্বেগ বেড়েছে। দুই দলের জ্যেষ্ঠ রাজনীতিকেরা এআই নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে একমত হয়েছেন। এ ক্ষেত্রে তারা ট্রাম্পের অবস্থানের বিপরীতে রয়েছেন। ট্রাম্প প্রযুক্তিটির উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণে আইন প্রণয়নের ধারণা প্রত্যাখ্যান করেছেন।
ঝুঁকি কোথায়?
প্রেসিডেন্ট ও বিচার বিভাগের পাশাপাশি কংগ্রেস যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের তিনটি প্রধান অঙ্গের একটি। আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমানে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট উভয়ই রিপাবলিকান পার্টির নিয়ন্ত্রণে। তবে দুই কক্ষেই তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা খুবই সামান্য।
প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের ২১৮টি আসন রয়েছে, যা নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম সংখ্যক আসন। তাদের সঙ্গে ভোট দেওয়া একজন স্বতন্ত্র সদস্যও রয়েছেন।
সিনেটে রিপাবলিকানদের ৫৩টি আসন রয়েছে। নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজন ৫১টি আসন।
বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা যদি অন্তত একটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করতে পারে, তাহলে তারা নিজেদের প্রস্তাবিত আইন কংগ্রেসে উত্থাপনের ক্ষমতা ফিরে পাবে।
কারা জিততে পারে?
অতীতে ভোটাররা অনেক সময় প্রেসিডেন্টের দলকে ‘শাস্তি’ দেওয়ার প্রবণতা দেখিয়েছেন এবং ক্ষমতাসীন দলের বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন।
সাম্প্রতিক জনমত জরিপে প্রেসিডেন্টের অনুমোদনের হার কম দেখা যাচ্ছে। জরিপভিত্তিক ওয়েবসাইট সিলভার বুলেটিনের তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদ শুরু করার সময় তার অনুমোদনের হার ছিল ৫০ শতাংশের সামান্য বেশি।
তবে অক্টোবরের শুরুতে তা প্রায় ৩৭ শতাংশে নেমে আসে। একই সময়ে ৬১ শতাংশ মানুষ তার কর্মকাণ্ডে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
তবে প্রতিটি কক্ষের সব আসন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নয়। কিছু আসন রিপাবলিকান বা ডেমোক্র্যাটদের জন্য তুলনামূলকভাবে নিরাপদ বলে বিবেচিত হয়।
বিবিসির মার্কিন অংশীদার সিবিএস নিউজ সিনেটের নয়টি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে আইওয়া ও নিউ হ্যাম্পশায়ারের আসন রয়েছে। প্রতিনিধি পরিষদে অ্যারিজোনা ও ওহাইওসহ বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের ৪২টি প্রতিদ্বন্দ্বিতার দিকেও নজর রাখা হচ্ছে।
এবারের ভোটের ফল আরও অনিশ্চিত হতে পারে প্রতিনিধি পরিষনের নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ নিয়ে দুই দলের লড়াইয়ের কারণে।
রিপাবলিকানরা কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে নিজেদের জন্য বেশি সুবিধাজনক নির্বাচনী মানচিত্র তৈরির চেষ্টা করেছে। ডেমোক্র্যাটরাও একই ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে।
ট্রাম্পের জন্য এর অর্থ কী?
ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ অথবা সিনেটের যেকোনো একটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিলে ট্রাম্পের জন্য কংগ্রেসের মাধ্যমে আইন পাস করানো কঠিন হয়ে পড়বে।
এর ফলে তার অভ্যন্তরীণ নীতির পরিকল্পনাগুলো বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তবে নিজের দলের বৃহত্তর সমর্থন ছাড়াও ক্ষমতা প্রয়োগের বিভিন্ন উপায় ট্রাম্প এরই মধ্যে ব্যবহার করেছেন।
ডেমোক্র্যাটরা যেকোনো একটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিলে কংগ্রেসের বিভিন্ন কমিটি ব্যবহার করে ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড তদন্ত করতে পারবে।
দুর্নীতির অভিযোগ, নতুন হোয়াইট হাউস বলরুম এবং অভিবাসন ও কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট বা আইসের কর্মকাণ্ড তদন্তের আওতায় আসতে পারে।
ট্রাম্পকে অভিশংসন বা ইমপিচ করার বিষয়েও ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ভেতরে আলোচনা রয়েছে। ইমপিচমেন্ট হলো কংগ্রেসে প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনার একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া, যা পরবর্তীতে রাজনৈতিক বিচারের ভিত্তি তৈরি করতে পারে। এটি ফৌজদারি মামলা নয়।
রিপাবলিকান পার্টি কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারলে ট্রাম্প তার মেয়াদের বাকি সময়ে নিজের পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাবেন।
২০২৮ সালের নির্বাচনে এর প্রভাব কী?
মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্টের নাম ব্যালটে থাকে না। তবে ট্রাম্প রিপাবলিকানদের এমনভাবে ভোট দিতে বলেছেন, যেন তার নামই ব্যালটে রয়েছে এবং এখন পর্যন্ত তার কর্মকাণ্ডের প্রতি সমর্থন হিসেবে তাকে ভোট দেওয়া হচ্ছে।
ফলাফল যেদিকেই যাক, বিশ্লেষকেরা যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ ট্রাম্পের নেতৃত্বে দেশের যে দিকে এগিয়ে যাওয়াকে কীভাবে দেখছেন, তা ব্যাখ্যা করতে এই ফল ব্যবহার করতে পারেন।
ট্রাম্প তৃতীয়বার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না। তাই মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর থেকেই ২০২৮ সালের জন্য রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে তার উত্তরসূরি কে হতে পারেন, তা নিয়ে আলোচনা জোরালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একইভাবে ডেমোক্র্যাটদের পক্ষ থেকে কে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন, তা নিয়েও আলোচনা শুরু হতে পারে।