
আল-আজহারের সরাসরি তত্ত্বাবধানে ফরিদাবাদ মাদ্রাসায় শুরু হচ্ছে আরবি ভাষা শিক্ষা কার্যক্রম
মিসবাহ উদ্দীন মাদানী
প্রকাশ: বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬, ১৯:৪৩

মরুভূমি ও মসজিদ। কৃত্তিম ছবি।
মুগিছ ও বারিরাহর দাম্পত্য জীবন ভালই কাটছিল। জীবন নিয়ে কোন উচ্চাভিলাশ ও স্বপ্ন তাদের ছিলনা। ছিলনা একে অপরের প্রতি কোন উচ্চাশা। কোনভাবে জীবনটা কাটিয়ে দিতে পারলেই হয়। এ নিয়েই তারা একে অপরের প্রতি সন্তুষ্ট।
অতটুকুন দাম্পত্য জীবনই তাদের জন্য নেয়ামত। কারণ তারা দু'জনই ছিল দাস-দাসী। দাসত্বের কঠিন শৃংখলে আবদ্ধ জীবন। যেখানে সুযোগ নেই মুক্ত বিহঙ্গের মত উড়ে বেড়ানোর। স্বাধীনভাবে স্বপ্ন দেখার। কল্পনায় সুখ ও ভালবাসার ছবি আঁকার। ক্লান্ত ও তৃষিত জীবনে একটু প্রশান্তি ও ভালবাসার আশ্রয়ের জন্য নারী-পুরুষ একে অপরকে জীনবন্ধুরূপে গ্রহণ করার স্বপ্নতো কেবল দূরাশাই। এর মধ্যে যে, মুনিবের অনুগ্রহ ও সম্মতিতে তারা দু'জন বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে পেরেছে তাই তাদের বিশ্বজয়।
পরাধীন হলেও তারা যাপন করছিল যুগলজীবনের বর্ণীল বসন্ত। তাদের জীবনে সন্তানও আসল। রাসুল সা. এর শহর মদীনায়ই ছিল তাদের বসবাস। এগুলো রাসুল সা. এর নবুওতী জীন্দেগীর শেষের দিকের ঘটনা। ইসলাম তার রক্তঝরা সংগ্রামের দিনগুলো পেরিয়ে তখন স্বাধীনভাবে হেদায়াতের দ্যুতি ছড়াচ্ছে।
ইসলাম তখন স্বমহিমায় সমুন্নত। অপ্রতিদ্বন্দ্বী। অপরাজেয়। মানুষ ইসলামে খুঁজে পেয়েছে শান্তি, মুক্তি ও স্বাধীনতার প্রকৃত যামানত। ইসলামের ন্যায়-ইনসাফের সুবাতাস সমস্ত মানবজাতিকে স্পর্শ করেছিল। ধনী-গরীব, ছোট-বড়, নারী-পুরুষ, এমনকি দাস-দাসীকেও।
বারীরাহ হযরত আয়েশা রা. এর ঘরে কাজ করত। এর মধ্যে একদিন শুনতে পেল, হযরত আয়েশা রা. বারীরাহকে দাসত্ব থেকে মুক্তির চিন্তাভাবনা করছেন। আয়েশা রা. রাসুলুল্লাহ সা. এর সাথে পরামর্শ করার সময় সে শুনতে পেয়েছে।
মন-মানস, চিন্তা ও স্বপ্নের বদ্ধ দরজা যেন হঠাৎ অকল্পনীয় ভাবে খুলে গেল। হৃদয়ের উপর ভারী পাথরের বোঝা যেন আস্তে করে সরে গেল। তার স্বপ্নশক্তি ধীরে ধীরে সতেজ হতে লাগল। কল্পনার ভাঙ্গা ডানাগুলো কী এক অলোকিক শক্তিতে উড়তে শুরু করল। দুর্ভাগা মুগিছ বারীরাহর রহস্যময় পরিবর্তন আঁচ করতে পারল।
সে আনমনা হয়ে কি যেন ভাবে। চির পরিচিত চেহারাটায় অপরিচিত এক আনন্দের দ্যুতি খেলা করে। মাঝে মাঝে আবার সে চেহারা মলিনতায় ছেয়ে যায়। কিছুদিন যেতে না যেতেই বারীরাহ জানতে পারল, আয়েশা রা. তাকে মুক্তির সব বন্দোবস্ত করে ফেলেছে। এদিকে মুগিছও সব জানতে পারল।
কিন্তু মুগিছকল্পনাও করতে পারেনি, তার জীবনের সমস্ত প্রেম-ভালবাসা ও আনন্দ-বেদনার একমাত্র আশ্রয় বারীরাহ তাকে ছেড়ে ইতোমধ্যে নতুন জীবনের পরিকল্পনা ও স্বপ্ন এঁকে ফেলেছে। দাসত্ব থেকে মুক্তির দিনটির অপেক্ষা শুধু। বারীরাহ মুগিছকে তার সিদ্ধান্তের কথা একদিন আড়ষ্ট ভঙ্গীতে জানিয়ে দিল। মুগিছের চেহারাটি বেদনায় নীল হয়ে গেল। হৃদয়টা ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। হৃৎপিণ্ডের রক্তপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম। বারীরাহকে অনেক বুঝিয়েও কোন কাজ হয়নি।
বারীরাহ আজ মুক্ত। দাসত্বের কঠিন শৃংখল আর নেই। ইসলাম তাকে একজন পরিপূর্ণ নারীসত্ত্বার সীকৃতি দিয়েছে। একজন দাসী আযাদ হওয়ার পর যে অধিকারগুলো ইসলাম তাকে দান করে তার মধ্যে অন্যতম হল, তার স্বামীও যদি দাস হয় তাহলে বিচারকের মাধ্যমে সে পূর্বের বিবাহিত সম্পর্ক বহাল রাখা বা না রাখার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার পায়।
মুক্তির শুভ সকাল। বারীরাহ ছুটে চলছে রাসুল সা. এর দরবারে। এদিকে মুগিছ বিষাদ হৃদয়ে বারীরাহর পিছনে পিছনে ঘুরছে। ভালবাসার দোহায় দিয়ে বহু আবদার করেও বারীরাহকে সিদ্ধান্ত থেকে ফিরাতে পারছেনা। এরপরের ঘটনার অবিকল বর্ণনা প্রত্যক্ষদর্শী কিশোর সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. এর জবানীতে শুনুন।
তিনি বললেন: এখনো ঐদিনের ঘটনাটি আমার চোখের সামনে স্পষ্ট ভাসছে। মুগিছ বারীরাহর পিছনে ছুটে চলছে এমন অবস্থায় যে, তার গণ্ডদেশ ভিজে দাড়ি বেয়ে টপ টপ ঝরছে বিরহ ও বিষাদের অশ্রু। এই দৃশ্য দেখে রাসুল সা. মজলিসে উপস্থিত (বর্ণনাকারী সাহাবীর পিতা) চাচা হযরত আব্বাস রা. কে বললেন, হে আব্বাস! বারীরাহর প্রতি মুগিছের প্রচণ্ড ভালবাসা সত্ত্বেও মুগীছকে বারীরাহর অপছন্দের দৃশ্য কি আপনার কাছে বিস্ময়কর লাগছেনা?
অত:পর রাসুল সা. বারীরাহকে বললেন: তুমি যদি মুগিছ থেকে বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত না নিতে! সে তো তোমার (কলিজার টুকরো) সন্তানেরই পিতা।
রাসুল সা. এর এই প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে বারীরাহ আদবের সাথে বলল: হে আল্লাহর রাসুল! এটি কি আপনার আদেশ? তিনি বললেন: না, বরং মুগীছের পক্ষ থেকে সুপারিশ করছি। তখন বারীরাহ বিনয়ের সাথে বলল: তার কাছে থাকার আমার ইচ্ছা নেই। তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আর অপেক্ষা না করে তাদের মধ্যে বিচ্ছেদের ফায়সালা দিয়ে দিলেন।
বারীরাহর হৃদয়ে মুগীছের জন্য দুঃখ ছিল। রাসুল সা. এর সুপারিশের প্রতিও সম্মান ছিল। পক্ষান্তরে নিজ অধিকারের বিষয়েও সচেতন ছিল। বড়দের আদেশ অমান্য করা যায় না। কিন্তু যে কারো সুপারিশ ও পরামর্শ গ্রহণ করা ও না করার অধিকার থাকে।
রসুল সা. এর এই উদার আচরণে বারীরাহর মুখে হাসি ফুটল। নারী স্বাধীনতার অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপিত হল। একদিকে মুগীছের অশ্রু, সন্তান ও সংসার। অন্যদিকে সদ্য মুক্ত বারীরাহর ব্যক্তিগত রুচি ও পছন্দ-অপছন্দের অধিকার। রাসুলুল্লাহ সা. উভয়ের মধ্যে একজন মহানুভব মুরব্বির ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন।
কিন্তু কারো উপর কোনটাই চাপিয়ে দিলেননা।এভাবে আশ্রয় পেল সুন্নাহর সবুজ যমিনে একজন অবলা নারীর অধিকার। (সূত্র: কিতাবুত তালাক, সহিহ বুখারি। কিতাবু আদাবিল কুজাত, সুনানে নাসাঈ।)