
সৌদির দুই বিমানবন্দরে হুতিদের হামলায় নিহত ৩, আহত ৩৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৫৯

দিল্লির জ্ঞানেশ কুমার বিরোধী আন্দোলনে পুলিশের ধরপাকড়ের মধ্যে ব্যারিকেডের ওপর বসে আছেন নেহা বোরা। ছবি: সংগৃহীত
‘দিল্লিতে রক্তক্ষরণ হলে কলকাতা উঠে দাঁড়ায়, কলকাতার রক্ত বইলেও দিল্লি পাশে থাকবে’। গত সোমবার (৫ অক্টোবর) বিকেলে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে দাঁড়িয়ে যখন নেহা বোরা এই ভাষণটি দিচ্ছিলেন, তখন স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল যে তার গলা ভেঙে গেছে, কথা বলতে অস্বস্তি হচ্ছে।
নেহা বোরা নকশালপন্থি দল সিপিআইএমএল (লিবারেশন)এর ছাত্র সংগঠন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন বা আইসার সভাপতি। তিনি যখন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষণ দিচ্ছিলেন, তার ঠিক একদিন আগেই দিল্লিতে পুলিশের হাতে আটক হন। যন্তর-মন্তর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে নারেলা অঞ্চলে নিয়ে গিয়ে তাকে সন্ধ্যাবেলায় ছেড়ে দেওয়া হয়। তার আগের টানা দুই দিন দিল্লিতে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তিও করেছেন।
তাই স্টেজে উঠেই তিনি বলেন, ‘আমার গলা ও শরীরের যা অবস্থা যেমন ভাঙা তেমনই অবস্থা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ও এসআরএফটিআইএর।’
এই যাত্রার শুরুটা হয় ২০২৬ সালের জুলাই মাসে। ভারতে মেডিকেল কলেজে ভর্তির প্রবেশিকা পরীক্ষা ‘নিট’-এর প্রশ্নপত্র ফাঁস মামলায় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে অনশনরত অভিজিৎ দীপকে ও সোনম ওয়াংচুকের পাশাপাশি আরও একটি মুখ সারা দেশের নজর কেড়েছিল। তিনি ছিলেন নেহা বোরা, যিনি ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)-র এই প্রতিবাদের সমর্থনে তার কয়েকজন সঙ্গীর সঙ্গে অনশন করছিলেন।
বিভিন্ন আন্দোলনে নেহা বোরার অংশগ্রহণ
নেহা বোরা যে মূল পার্টির ছাত্র সংগঠনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, সেই সিপিআই (এমএল) লিবারেশন পার্টির ভারতে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির সংখ্যা ছয়। এর মধ্যে দুই জন বিহারের ও দুইজন ঝাড়খণ্ড রাজ্যের বিধায়ক এবং আরও দুইজন বিহারের কারাকাট ও আরা সংসদীয় আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সসদ্য।
যদিও ছাত্র সংগঠন আইসা দেশের বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে সক্রিয় ছাত্র রাজনীতি করে থাকে।
সিজেপি আন্দোলনের পরে ফের আলোচনায় আসেন যখন তিনি ঝাড়খণ্ড পাবলিক সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষায় কথিত অনিয়মের বিরুদ্ধে ছাত্র আন্দোলনে অংশ নিতে রাঁচিতে পৌঁছেছিলেন। সেই সময়ে তার মুখে কালি ছুড়ে মারা হয়। কিন্তু নেহা বলেন, ‘মুখে কালি ছুড়ে মারলে আমি ভয় পাওয়ার মানুষ নই। দিল্লির আন্দোলনের সময়ে আমি প্যালেট গান এবং লাঠিচার্জেরও মুখোমুখি হয়েছি।’
তিনি বিরোধীদের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘তারা কি মনে করেন, কালি ছুড়ে মেরে সারা দেশের ছাত্র-যুবদের ক্ষোভকে দমিয়ে রাখা যাবে?’
এরপর তিনি বিহারে গিয়ে সিজেপির বিক্ষোভের সময়ে গ্রেফতার হওয়া ছাত্রদের মুক্তির দাবিতে আন্দোলন করেন। গত কয়েক বছর ধরে ছাত্র রাজনীতিতে সক্রিয় নেহা বোরা এখন দেশের চলমান যুব ও ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ হিসেবে উঠে এসেছেন। দৃঢ় অবস্থান, স্পষ্টভাষী বক্তৃতা এবং লড়াকু মনোভাবের কারণে নেহা বোরা আজকাল সংবাদমাধ্যমে ব্যাপকভাবে আলোচিত। সামাজিক মাধ্যমে তার বক্তৃতার একাধিক রিল ভাইরাল হয়েছে।
এখন নেহা বোরা আবার দিল্লিতে তার সমর্থকদের নিয়ে আন্দোলনে নেমেছেন। এবার তিনি এবং তার সমর্থকরা মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে মাঠে নেমেছেন। একাধিক বিরোধী দলের অভিযোগ, দেশে চলমান এসআইআর প্রক্রিয়ায় কথিত অনিয়মের জন্য জ্ঞানেশ কুমার দায়ী এবং এর ফলে কোটি কোটি মানুষ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ হারিয়েছেন।
সম্প্রতি ইংরেজি সংবাদপত্র ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস তাদের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করেছিল, এসআইআর প্রক্রিয়াকে ঘিরে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং দুই নির্বাচন কমিশনারের মধ্যে মতপার্থক্য ছিল।
নেহার পথচলা: বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যুব আন্দোলনের অন্যতম মুখ হয়ে ওঠা
নেহা উত্তরাখণ্ডের বাসিন্দা। তিনি প্রথমে দিল্লি ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন এবং পরে আম্বেদকর ইউনিভার্সিটি, দিল্লি থেকে এমএ সম্পন্ন করেন। বর্তমানে তিনি দিল্লির জওহরলাল নেহরু ইউনিভার্সিটি (জেএনইউ)-তে পিএইচডি করছেন।
দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় এবং জেএনইউ-তে বামপন্থি ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ নেহা বোরা। তাকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বেশ সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়। বর্তমানে তিনি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গণআন্দোলন ও বামপন্থী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ হিসেবে ক্রমশ উঠে আসছেন।
পথে নেমেই পথ চিনেছেন নেহা
গত মাসে ফ্রন্টলাইন পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নেহা বলেছিলেন, “যন্তর-মন্তরেও বিপুল সংখ্যক পোস্টার লাগানো হয়েছিল। সেখানে লেখা ছিল, ‘আপনারা গডসেকে বিশ্বাস করেন, আমরা ভগৎ সিংকে বিশ্বাস করি। এটাই আপনার এবং আমার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য, আর সেই কারণেই আপনাদের ক্ষমতা ছাড়তে হবে’। মানুষ বারবার বলছিল যে, যারা গডসেকে বিশ্বাস করে, তারা এই দেশ শাসন করবে না।”
তিনি আরও বলেন, ‘এখানে আরএসএস-এর সেই সংস্কৃতির কথা বলা হচ্ছিল, যা দেশের মানুষের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল। বলা হচ্ছিল, তারা গডসের পক্ষে দাঁড়িয়ে আছে আর আমরা ভগৎ সিংয়ের পক্ষে। আলোচনা হচ্ছিল এই বিষয়েও যে, তাদের বিভাজনের রাজনীতি দেশকে এমন অবস্থায় এনে ফেলেছে, যেখানে প্রশ্নপত্র ফাঁস আর বড় কোনও বিষয় বলে মনে হয় না। কিন্তু এসব আলোচনা মূলধারায় উঠে এলেই হিন্দু-মুসলমান সংক্রান্ত বয়ান এসে হঠাৎই মানুষের সমস্ত মনোযোগ কেড়ে নেয়।”
তিনি এও বলেছিলেন, ‘আমার মনে হয়, এই আন্দোলনগুলো দেখিয়ে দিয়েছে যে দেশের তরুণ প্রজন্ম বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর কাছ থেকে কী চায় না। আমার মনে হয়, এই আন্দোলন আমাদের সবাইকে যে শিক্ষা দিয়েছে, তা শুধু এই উপলব্ধির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় যে, ফ্যাসিবাদীদের কাছ থেকেও জবাবদিহি আদায় করা সম্ভব। সেই কারণেই অনশন থেকে ফিরে যখন আমি মাইকে কথা বলছিলাম, তখন আমি বলেছিলাম যে তরুণদের এই অনুভূতিটা মনে রাখা উচিত। একে অপরের বিরুদ্ধে নয়, বরং একে অপরের জন্য লড়াই করার অনুভূতি।”
বিজেপি সমর্থক পরিবার, বামপন্থি নেহার মধ্যে মতপার্থক্য
নেহা বোরা এমন একটি পরিবারে জন্ম নিয়েছেন, যারা দীর্ঘদিন ধরেই বিজেপি-সমর্থক।
সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘আমার নিজের পরিবারেই বিজেপির কট্টর সমর্থক রয়েছেন এবং আমাদের বাড়িতে এ নিয়ে বড় ধরনের মতপার্থক্য ছিল। আমি যখন থেকে দিল্লিতে এসেছি এবং রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হয়েছি, তখন থেকেই বাড়িতে এই মতপার্থক্য চলছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘অনেক সময় পরিস্থিতি খুবই উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে। তবে আমার মনে হয়, আর্থিক বিষয় এবং নিজের জীবনসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আমি যথেষ্ট স্বাধীন ছিলাম এবং নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নিতে পেরেছি। স্নাতক পড়াশোনার দ্বিতীয় বা তৃতীয় বর্ষ থেকেই আমি এই স্বাধীনতা পেয়েছিলাম, কারণ সেটাই ছিল আমার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়।’
‘একে অপরের জন্য লড়লে পরিবর্তন আনা সম্ভব’
নেহা বোরার মতে, সিজেপি আন্দোলনের গুরুত্ব শুধু ধর্মেন্দ্র প্রধান-এর পদত্যাগের দাবিতে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি বিশ্বাস করেন, তরুণ প্রজন্ম এই আন্দোলন থেকে শিখেছে যে একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর বদলে একে অপরের জন্য লড়লে পরিবর্তন আনা সম্ভব।
নেহা চান, যন্তর-মন্তর আন্দোলন থেকে যে শক্তি ও উদ্দীপনার জন্ম হয়েছে, তা যেন এসআইআর, নির্বাচনক্ষেত্র পুনর্নির্ধারণ (ডিলিমিটেশন), শ্রমিকদের অধিকার এবং নারীদের সংরক্ষণের মতো অন্যান্য বিষয়ক আন্দোলনেও ছড়িয়ে পড়ে।
তার কাছে এই আন্দোলন গণতন্ত্র এবং দেশের গণতান্ত্রিক, সমাজতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামো রক্ষার বৃহত্তর সংগ্রামের একটি অংশ।
সিজেপির নিট আন্দোলনে নেহার উপলব্ধি
বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে যন্তর-মন্তরের আন্দোলন সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে নেহা বোরা বলেছিলেন, এই আন্দোলন দেখিয়েছে যে একে কোনো নির্দিষ্ট খোপ বা শ্রেণিতে ফেলা যায় না। তার মতে, এটিই এই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় শক্তি, এবং তিনি চান এই বৈশিষ্ট্য অটুট থাকুক।
তিনি জানান, ‘যন্তর-মন্তরের আন্দোলনের সময়ে অনেকেই বলেছেন, বহু প্রতিবাদী ছাত্রদের মায়েরা তাদের প্রতিবাদে যোগ দিতে উৎসাহিত করেছিলেন। কেউ কেউ বলেছেন, তারা স্কুলে যাননি, কারণ তারা আন্দোলনে অংশ নিতে চেয়েছিলেন।’
তার মতে, ‘এটি একটি পরিবর্তনেরই ইঙ্গিত, ঘৃণার রাজনীতির দিকে ঠেলে দেওয়া একটা দেশে মানুষ একে অপরের হাত ধরতে শিখেছে।’
ওই সাক্ষাৎকারে নেহা বোরা আরও জানান, আন্দোলনের সময়ে বিজেপি-সমর্থক বাবা-মা এবং বয়স্ক ব্যক্তিরাও তার কাছে এসেছিলেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন এবং ছাত্রদের পরিস্থিতির জন্য দুঃখপ্রকাশ করেন।
ফ্রন্টলাইন-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি নিজের পরিবারের উদাহরণ টেনে বলেন, তার বিজেপি-সমর্থক মা পুলিশি পদক্ষেপ নিজের চোখে দেখার পর আন্দোলনকারীদের প্রচেষ্টার প্রশংসা করেছিলেন।
নেহা বোরার মতে, এই ধরনের মানসিক ও সামাজিক পরিবর্তনই আন্দোলনটিকে আরও বিস্তৃত সামাজিক প্রভাব সৃষ্টি করতে সাহায্য করেছে।
অভিজিৎ দীপকের সঙ্গে নেহা বোরার তুলনা প্রসঙ্গে
গত কয়েকদিন ধরে সামাজিক মাধ্যমে একটি আলোচনা দেখা যাচ্ছে, যেখানে সিজেপি-র প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকের সঙ্গে নেহা বোরার তুলনা করে মানুষ বিতর্ক শুরু করেছেন, যে কে বেশি ‘ম্যাচিউর’।
সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ এক ব্যবহারকারী নেহা বোরার ছবি পোস্ট করে লিখেছিলেন, ‘ম্যাচিউরিটি হলো, যখন আপনি বুঝতে পারবেন যে নেহা বোরা অভিজিৎ দীপকের চেয়ে বেশি প্রতিভাবান। তিনি জেন-জি প্রজন্মের একেবারে আইকন, আর তার স্টাইল ও ব্যক্তিত্ব দুর্দান্ত।’
সেই পোস্টটি শেয়ার করে অভিজিৎ দীপকে নিজেই লিখেছিলেন, ‘আমি এর সঙ্গে একমত।’
তবে ওই পোস্টের কিছুক্ষণ পরই নেহা এক্স-এ লেখেন, ‘তুলনা নয়, সংহতি। আমরা একসঙ্গে লড়ি।’ এর জবাবে অভিজিৎ লিখেছিলেন, ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’।
সিজেপি-র আন্দোলনের সময়ে যন্তর-মন্তরে এক বিক্ষোভে বক্তৃতা দিতে গিয়ে নেহা বোরা নিজেও বলেছিলেন, দীপকে বিনয়ী, অন্যদের পরামর্শ গ্রহণ করতে প্রস্তুত থাকেন এবং তিনি আন্দোলনকারীদের এই উপলব্ধি করিয়েছেন যে, তিনিও তাদের মতোই এই সংগ্রামের একজন ছাত্র ও সহযোদ্ধা।
সূত্র: বিবিসি