
আত্মশুদ্ধির মেহনত ছাড়া সমাজ সংস্কার অসম্ভব: বরুণার পীর

শাইখুল হাদিস আল্লামা মাওলানা মুহাম্মাদ ইছহাক কাসেমী
দেশের প্রবীণ আলেম, বিশিষ্ট মুহাদ্দিস ও হাজারো আলেমের উস্তাদ শাইখুল হাদিস আল্লামা মাওলানা মুহাম্মাদ ইছহাক কাসেমী গুরুতর অসুস্থ হয়ে রাজধানীর একটি হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় দেশবাসী, উলামায়ে কেরাম, ছাত্র ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাছে তার সুস্থতার জন্য বিশেষ দোয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবেটিস ও শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন এই প্রবীণ আলেম। বিশেষ করে অ্যালার্জিজনিত শ্বাসকষ্টের সমস্যা সম্প্রতি প্রকট আকার ধারণ করেছে। এর আগে প্রায় তিন বছর আগে একই সমস্যায় তাঁকে টানা ১৫ দিন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়েছিল। গত এক মাস আগেও তিন দিন হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন তিনি। বর্তমানে শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় আইসিইউতে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
১৯৩৮ সালে চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলার চাঁদপুর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন আল্লামা মুহাম্মাদ ইছহাক কাসেমী। তার পিতা ছিলেন মৌলভী সাদেক আলী।
শিক্ষাজীবনে স্থানীয় বিভিন্ন মাদরাসায় পড়াশোনা শেষে উচ্চতর দ্বীনি শিক্ষার জন্য ১৯৬২ সালে মাত্র ১০ টাকা সম্বল করে পাড়ি জমান ভারতে। প্রথমে দারুল উলুম সাহারানপুর এবং পরে ঐতিহাসিক দারুল উলুম দেওবন্দে অধ্যয়ন করেন। দীর্ঘ প্রায় নয় বছরের সাধনা ও অধ্যবসায়ের পর দাওরায়ে হাদিস সম্পন্ন করে দেশে ফিরে আসেন।
শিক্ষাজীবনে তিনি উপমহাদেশের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও বুযুর্গ আলেমদের সান্নিধ্য লাভ করেন। তাঁদের মধ্যে শাইখুল হাদিস আল্লামা জাকারিয়া কান্ধলভী, আল্লামা ফখরুদ্দিন আহমদ মুরাদাবাদী, আল্লামা মাহমুদুল হাসান গাঙ্গুহী ও আল্লামা শরীফ হাসান দেওবন্দী উল্লেখযোগ্য।
দেশে ফিরে ঢাকার বড় কাটারা মাদরাসায় শিক্ষকতার মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে তাতীবাজার ইসলামিয়া মাদরাসায় দীর্ঘ ১৮ বছর এবং জামিয়া মাদানিয়া বারিধারা মাদরাসায় শিক্ষকতা করেন। ১৯৯৭ সালে মানিকনগরে প্রতিষ্ঠা করেন জামিয়া মাহমুদিয়া ইসহাকিয়া মাদরাসা। প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রতিষ্ঠানটির মুহতামিম হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে শাইখুল হাদিসের দায়িত্বও পালন করে আসছেন।
দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে তার হাতে গড়ে উঠেছেন অসংখ্য আলেম ও দ্বীনি ব্যক্তিত্ব। তার ছাত্রসংখ্যা ৫০ হাজারের বেশি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়। তার উল্লেখযোগ্য ছাত্রদের মধ্যে রয়েছেন জামিয়া শায়েখ জাকারিয়া কাচকুড়ার প্রতিষ্ঠাতা মুহতামিম আল্লামা পীর ডক্টর মোস্তাক আহমদ, মালিবাগ মাদরাসার শাইখুল হাদিস আল্লামা জাফর আহমদ এবং মধ্য বাড্ডা মাদরাসার শাইখুল হাদিস আল্লামা ওসমান গনি।
ইলমি খেদমতের পাশাপাশি আত্মশুদ্ধি ও ইসলাহের কাজেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন তিনি। শাইখুল হাদিস আল্লামা জাকারিয়া কান্ধলভীর হাতে বাইয়াত গ্রহণ করেন এবং পরবর্তী সময়ে আল্লামা নূর হুসাইন কাসেমী রহ.-এর কাছ থেকে খেলাফত ও ইজাজত লাভ করেন। তার উদ্যোগে মানিকনগর মাদরাসায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ‘খানকায়ে মাহমুদিয়া’, যেখানে নিয়মিত ইসলাহি কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
পারিবারিক জীবনেও দ্বীনি শিক্ষার ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছেন এই আলেম। তার ছয় ছেলে বর্তমানে বিভিন্ন মাদরাসা ও মসজিদে ইমাম, খতিব, মুহাদ্দিস, মুফতি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল হিসেবে দ্বীনি খেদমতে নিয়োজিত রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন মুফতি মুহাম্মাদুল্লাহ সাদেকী।
তার গুরুতর অসুস্থতার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর দেশজুড়ে ছাত্র, ভক্ত ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তার অন্যতম বিশিষ্ট ছাত্র আল্লামা পীর ডক্টর মোস্তাক আহমদও তার সুস্থতা কামনা করে দেশবাসীর কাছে দোয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
এদিকে পরিবারের সদস্য, ছাত্র ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা মহান আল্লাহর কাছে এই প্রবীণ মুহাদ্দিসের পূর্ণ সুস্থতা ও নেক হায়াত কামনা করেছেন। তাঁরা দেশবাসী ও উলামায়ে কেরামের কাছে বিশেষভাবে দোয়া চেয়েছেন।