
মসজিদে নববীতে নারীরা যে জায়গায় বসে বয়ান শুনেন

আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির, শায়খুল হাদিস আল্লামা মুফতি রশীদুর রহমান ফারুক বর্ণভী
আত্মশুদ্ধির মেহনত ছাড়া সমাজ সংস্কার সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির শায়খুল হাদিস আল্লামা মুফতি রশীদুর রহমান ফারুক বর্ণভী (পীর সাহেব বরুণা)। তিনি বলেছেন, আত্মশুদ্ধির মাধ্যমেই আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের পরিপূর্ণ আনুগত্য অর্জন সম্ভব। সাহাবায়ে কেরাম ইসলাম গ্রহণের পর আত্মশুদ্ধির সাধনায় নিজেদের জীবন পরিবর্তন করে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। সমাজে বিদ্যমান অনাচার, হত্যা, দুর্নীতি ও অরাজকতা দূর করতেও আত্মশুদ্ধির মেহনত প্রয়োজন।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের ৮২ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত আজিমুশশান ইসলাহী ইজতেমায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
বাদ ফজর শুরু হওয়া এ ইজতেমায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাখো ধর্মপ্রাণ মুসল্লি অংশ নেন। তাদের উদ্দেশে বরুণার পীর বলেন, মানুষের প্রকৃত সফলতা দুনিয়ার প্রাচুর্য কিংবা বাহ্যিক উন্নতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ঈমানের দৃঢ়তা, আমলের বিশুদ্ধতা, চরিত্রের সৌন্দর্য এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মধ্যেই জীবনের প্রকৃত সার্থকতা নিহিত। এ জন্য নিয়মিত আত্মসমালোচনা, দ্বীনি পরিবেশের সাহচর্য এবং উপকারী নসিহত গ্রহণের মাধ্যমে নিজেদের সংশোধনে মনোযোগী হতে হবে।
তিনি বলেন, ১৯৪৪ সালে শায়খুল ইসলাম আল্লামা লুৎফুর রহমান বর্ণভী রহ. আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করেন। সংগঠনটির মূল উদ্দেশ্য ছিল মানুষকে কোরআন-সুন্নাহর শিক্ষা, সুন্নতের অনুশীলন, আত্মশুদ্ধি ও নৈতিক চরিত্র গঠনের প্রতি আহ্বান জানানো। এই ইসলাহী ধারার যথাযথ পরিচর্যা ও অগ্রযাত্রা নিশ্চিত করা সবার দায়িত্ব।
পীর সাহেব বরুণা আরও বলেন, আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলাম কারও ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি নয়, কাউকে ক্ষমতা থেকে নামানোরও কোনো এজেন্ডা নেই। দলমত-নির্বিশেষে মানুষকে এক আল্লাহর দিকে আহ্বান এবং তাঁর আদেশ-নিষেধ পালনে উদ্বুদ্ধ করাই এ সংগঠনের লক্ষ্য।
পরিবারে দ্বীনি শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রতিটি ঘর একেকটি মাদরাসায় পরিণত হওয়া উচিত। এ জন্য পরিবারের সদস্যদের নিয়ে প্রতিদিন অন্তত ১০ থেকে ১৫ মিনিট কোরআন তিলাওয়াত, দ্বীনি বই পাঠ ও প্রয়োজনীয় মাসআলা-মাসায়েল শেখার ব্যবস্থা করতে হবে। সন্তানদের কোরআন, নামাজ, ঈমান-আকিদা ও ইসলামী আদব শেখানোর পাশাপাশি মক্তব বা উপযুক্ত দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে।
মসজিদের ইমামদের উদ্দেশে তিনি বলেন, জুমার নামাজের আগে মুসল্লিদের একটি করে ছোট সূরা শেখানোর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। সূরা ফাতেহা দিয়ে শুরু করে ধারাবাহিকভাবে ৫২ সপ্তাহে অন্তত ১০টি সূরা শুদ্ধভাবে শেখানোর চেষ্টা করতে হবে। পাশাপাশি প্রতি জুমায় একটি করে জরুরি মাসআলা সহজভাবে আলোচনা ও প্রয়োজনে হাতে-কলমে শেখানোর ব্যবস্থা করা উচিত।
ইজতেমায় বক্তব্য দেন আল্লামা আব্দুল হামিদ পীর মধুপুর। তিনি কাদিয়ানীদের রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম ঘোষণার দাবি আদায়ে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।
জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি আব্দুল মালেক বলেন, ঈমানের সঙ্গে তাকওয়া অর্জন জরুরি। ফরজ ও ওয়াজিব আদায়ের পাশাপাশি সব ধরনের গুনাহ থেকে বিরত থেকে আখিরাতের প্রস্তুতি নিতে হবে।
বেফাকের মহাসচিব মাওলানা মাহফুজুল হক তার বক্তব্যে এলজিবিটিকিউ ও ট্রান্সজেন্ডার বিষয়ক প্রচারণার বিরোধিতা করেন। তিনি এসব বিষয়ে সামাজিক সচেতনতা তৈরির আহ্বান জানান।
সাবেক ধর্ম উপদেষ্টা ড. এ এফ এম খালিদ হোসেন বলেন, দেশের মুসলমানদের সন্তানদের ঈমান ও আমল রক্ষায় প্রাথমিক স্তরে রাষ্ট্রীয়ভাবে ধর্মীয় শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা এবং ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন। রাষ্ট্র এ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন না করলে অভিভাবকদের নিজেদের সন্তানদের ফরজে আইন পরিমাণ দ্বীনি শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেন, কোনো সংগঠনের প্রকৃত শক্তি শুধু তার পরিচিতি কিংবা বড় আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং কর্মীদের ইখলাস, দায়িত্বশীলদের আমানতদারিতা, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা এবং আদর্শের প্রতি অবিচলতার মধ্যেই এর ভিত্তি নিহিত। ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের ঊর্ধ্বে উঠে দ্বীনি লক্ষ্যকে প্রাধান্য দেওয়া এবং মতপার্থক্য সত্ত্বেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভ্রাতৃত্ব বজায় রাখা জরুরি।
ইজতেমায় আরও বক্তব্য দেন আওলাদে রাসুল সাইয়্যিদ ফয়সাল নাদীম, খেলাফত মজলিস মনোনীত সিলেট-৫ আসনের সংসদ সদস্য মুফতি আবুল হাসান, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী, ওলামা-মাশায়েখ আইম্মা পরিষদের সভাপতি মুফতি মিজানুর রহমান সাঈদ, মুফতি দিলাওয়ার হোসাইন, মাওলানা আকরাম আলী ফরিদপুর, মাওলানা খালিদ সাইফুল্লাহ আইয়ুবী, মুফতি সাখাওয়াত হোসাইন রাজী, মুফতি শেখ আহমদ আফজল বর্ণভী, মুফতি ইমাদুদ্দীন ফরিদাবাদ, হাফেজ মাওলানা আলী আকবর কাসেমী ও মুফতি সাইফুল ইসলাম ফারুকীসহ বিভিন্ন পর্যায়ের আলেম ও সংগঠনের নেতারা।
আঞ্জুমানের যুগ্ম মহাসচিব মুফতি শেখ সাদ আহমদ আমীন বর্ণভী, মুফতি ওয়াজেদ আলী ও মুফতি ফয়জুল্লাহ আশরাফীর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানটি পরিচালিত হয়।
ইজতেমায় অংশ নিতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পীর সাহেব বরুণার ভক্ত ও মুরিদরা বাস ও ট্রেনে করে রাজধানীতে আসেন। শুক্রবার ভোরের আগেই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মুসল্লিদের ব্যাপক সমাগম ঘটে। শেষ রাতে তাহাজ্জুদ, জিকির-আজকার ও মোনাজাতে অংশ নেন উপস্থিত মুসল্লিরা।
ইজতেমা উপলক্ষে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত হয় বৃহৎ জুমার জামাত। এতে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীসহ লক্ষাধিক মুসল্লি অংশ নেন।
আসরের পর পীর সাহেব বরুণার অশ্রুসিক্ত মোনাজাতের মধ্য দিয়ে ইজতেমার কার্যক্রম শেষ হয়। মোনাজাতে দেশ, জাতি ও মুসলিম উম্মাহর কল্যাণ কামনা করে বিশেষ দোয়া করা হয়।