
‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের’ উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী
খেলা ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬, ২০:৩৫

পর্তুগিজ তারকা এক ভিডিও বার্তায় অবসরের কথা জানিয়েছেন। ছবি: এএফপি
দীর্ঘ এক বিদায়ী বার্তায় জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন পর্তুগালের ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। সময়ের পাঠকদের জন্য তার বক্তব্যের পুরো অংশ এখানে তুলে ধরা হলো—
‘প্রিয় পর্তুগিজবাসী, জাতীয় দলের ৭ নম্বর জার্সিটি তুলে রাখার সময় এসেছে। আমি কখনওই মনে করিনি, জার্সিটি শুধুই আমার। তবে ২৩ বছর ধরে এটি পরার, এর মর্যাদা রক্ষা করার এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের স্টেডিয়ামে এটি বয়ে নিয়ে যাওয়ার সৌভাগ্য ও দায়িত্ব আমার হয়েছে।
আজ সময় এসেছে এই জার্সিটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়ার। সিদ্ধান্তটি সহজ ছিল না। কারণ কিছু সিদ্ধান্ত শুধু মস্তিষ্ক দিয়ে নেওয়া যায় না, হৃদয় দিয়েও নিতে হয়। ২০০৩ সালের আগস্টে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল এবং যা আমার জীবন চিরতরে বদলে দিয়েছিল, আজ তার সমাপ্তি ঘটল।
জাতীয় দলের হয়ে কাটানো দিনগুলোর দিকে ফিরে তাকালে আমি শুধু ম্যাচ, গোল, রেকর্ড কিংবা ট্রফি দেখতে পাই না। আমি দেখতে পাই মানুষকে। বিদেশে বসবাসকারী সেই পর্তুগিজদের দেখি, যারা ৯০ মিনিটের জন্য হলেও নিজেদের মাতৃভূমির একটু কাছাকাছি অনুভব করতেন। আমি দেখি লাখ লাখ পর্তুগিজ মানুষকে, যাদের সঙ্গে কখনও আমার দেখা হয়নি, অথচ তারা আমার জীবনের অংশ হয়ে উঠেছেন। কারণ দিনশেষে ফুটবল কেবল একটি খেলার চেয়ে অনেক বড় কিছু। ফুটবল মানুষের আবেগ, মানুষের ভালোবাসা।
জাতীয় দলের হয়ে পুরো ক্যারিয়ারজুড়েই আমি নিজের সামর্থ্যের সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছি। আমি জিততে চেয়েছি। আরও ভালো হতে চেয়েছি। ইতিহাস গড়তে চেয়েছি। নিজের কাছে সবসময় সর্বোচ্চ প্রত্যাশা রেখেছি। সবসময় আরও বেশি কিছু চেয়েছি। বিশ্বাস করেছি, আমরা আরও অনেক দূর যেতে পারব। আর এই জার্সির জন্য নিজের সর্বস্ব উজাড় করে দিয়েছি।
এমন অনেক বিকেল ও রাত এসেছে, যেগুলো ছিল নিখুঁত। এমন কিছু জয় এসেছে, যা কখনও ভুলব না। আবার এমন কিছু পরাজয়ও এসেছে, যেগুলোর কথা মনে পড়লে এখনও কষ্ট হয়। আমি ভুল করেছি। কষ্ট পেয়েছি। এমন মুহূর্তও এসেছে, যখন পর্তুগিজ জনগণ আমার কাছ থেকে যা প্রত্যাশা করেছিলেন, তা দিতে পারিনি। কিন্তু কখনও হাল ছাড়িনি। আর সবকিছুর ঊর্ধ্বে, পর্তুগালের প্রতিনিধিত্ব করতে পেরে কখনও গর্ববোধ করা বন্ধ করিনি।
বছরের পর বছর ধরে আমি কয়েকটি সহজ সত্য উপলব্ধি করেছি। গোলের মাহাত্ম্য একসময় ম্লান হয়ে যায়। ট্রফিগুলো একসময় জাদুঘরে স্থান পায়। রেকর্ডগুলোও একদিন ভেঙে যায়। কিন্তু এমন একটি বিষয় রয়েছে, যা সময় কখনো মুছে ফেলতে পারে না, মানুষের হৃদয়ে আমরা যে জায়গা করে নিই। আমি যদি কখনও আপনাদের আনন্দ দিতে পেরে থাকি, আমার কোনো একটি গোল যদি কখনও কাউকে কাউকে আলিঙ্গন করতে, দুশ্চিন্তা ভুলে যেতে কিংবা নিজের দেশ নিয়ে গর্ব করতে সাহায্য করে থাকে, তাহলে আমার সব পরিশ্রম সার্থক।
কারণ পর্তুগিজ হওয়ার অর্থও ঠিক এটাই। আমরা একসঙ্গে কষ্ট পাই, একসঙ্গে ঘুরে দাঁড়াই। আবার নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শিখি।
পর্তুগালের সবসময় এমন তরুণদের প্রয়োজন, যারা স্বপ্ন দেখার সাহস রাখে। এমন খেলোয়াড়দের প্রয়োজন, যারা কখনও হাল ছাড়ে না। এমন নতুন প্রজন্মের প্রয়োজন, যারা বিশ্বাস করে, এমন জায়গায় পৌঁছানো সম্ভব, যেখানে এর আগে কেউ কখনও পৌঁছাতে পারেনি। কারণ যে দেশ প্রতিনিয়ত নতুন নতুন নায়ক তৈরি করে, সেই দেশ কখনও নিজের ওপর বিশ্বাস হারায় না।
আমার সতীর্থদের উদ্দেশে বিশেষ কিছু বলতে চাই। প্রতিটি দৌড়, প্রতিটি আলিঙ্গন, প্রতিটি তর্ক-বিতর্কের জন্য ধন্যবাদ। মাঠে নামার আগের প্রতিটি নীরব মুহূর্তের জন্য, একসঙ্গে উদ্যাপন করা প্রতিটি জয়ের জন্য এবং আমাদের আরও শক্তিশালী করে তোলা প্রতিটি পরাজয়ের জন্য ধন্যবাদ। আপনাদের অধিনায়ক হতে পারা আমার জন্য ছিল এক বিরাট সৌভাগ্য। কিন্তু কোনো অধিনায়ক একা পথ চলেন না। আপনারা সবসময় আমার গল্পের অংশ হয়ে থাকবেন।
বিগত বছরগুলোতে আমার সঙ্গে কাজ করা সব কোচ, পরিচালক, চিকিৎসক, ফিজিওথেরাপিস্ট, কিট ম্যানেজার, স্টাফ সদস্য এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ। আপনাদের অনেককেই কখনও ছবিতে দেখা যায়নি। কিন্তু আপনারা না থাকলে সেই ছবিগুলো কখনওই সম্ভব হতো না।
আমার পরিবারের প্রতি কৃতজ্ঞতা। আমার এই স্বপ্নকে নিজেদের স্বপ্ন করে নেওয়ার জন্য ধন্যবাদ। আমার অনুপস্থিতি, ত্যাগ এবং সেই মুহূর্তগুলোর জন্য ধন্যবাদ, যখন জাতীয় দলকে সময় দিতে গিয়ে আপনাদের প্রাপ্য সময়টুকুও আমাকে দিতে হয়েছে। আমি আজ এতদূর আসতে পেরেছি, কারণ আমরা সবসময় হাতে হাত রেখে পথ চলেছি।
আর পর্তুগালের জনগণের উদ্দেশে, বিশ্বের যেখানেই থাকুন না কেন, প্রতিটি পর্তুগিজ মানুষের উদ্দেশে শেষবারের মতো একটি কথা বলতে চাই।
একটি দৃশ্য আমি সারাজীবন নিজের হৃদয়ে ধারণ করে রাখব। যখন আমাদের জাতীয় সংগীত বেজে ওঠে, আমি চারপাশে তাকাই। দেখি আমার সতীর্থদের, দেখি গ্যালারিতে থাকা দর্শকদের। দেখি শিশুদের, মায়েদের, বাবাদের এবং দাদা-দাদিদের। দেখি সেই পর্তুগিজ মানুষদের, যারা শুধু সেখানে উপস্থিত থাকার জন্য কত দূর থেকে ছুটে এসেছেন।
আর সেই কয়েক মিনিটের জন্য আমাদের মধ্যকার সব পার্থক্য যেন হারিয়ে যায়। সেখানে কোনো ক্লাব নেই, কোনো ভিন্ন রং নেই, কোনো শ্রেণিবিভাগ নেই, কোনো পেশা নেই, কোনো মতামতের বিভেদ নেই। সেখানে রয়েছে শুধু একটাই আবেগ, পর্তুগাল। এই অনুভূতিটুকুই আমি বাকি জীবন নিজের সঙ্গে বয়ে নিয়ে যাব।
আজ জাতীয় দলের হয়ে মাঠে আমার পথচলার সমাপ্তি ঘটল। আমি মাথা উঁচু করে বিদায় নিচ্ছি। নিজের পথচলার জন্য গর্বিত এবং এই বিশ্বাস নিয়ে যে পর্তুগালের জন্য আমার যা কিছু দেওয়ার ছিল, তার সবটুকুই দিয়েছি। কিন্তু আমি কখনওই আপনাদের একজন হওয়া বন্ধ করব না। পর্তুগালের প্রতিটি জয়ে আমি আগের মতোই কষ্ট পাব, উল্লাস করব এবং আনন্দ উদ্যাপন করব, সেই পরিচিত সিউ... ধ্বনিতে!
সারা জীবন আমি বিশ্বের সেরা খেলোয়াড় হওয়ার জন্য পরিশ্রম করেছি। আজ উপলব্ধি করছি, আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল বিশ্বের সেরা দেশটির প্রতিনিধিত্ব করার সম্মান অর্জন করা। এই ২৩ বছরের জন্য ধন্যবাদ। আমার ওপর বিশ্বাস রাখার জন্য ধন্যবাদ। আমাকে এমন একটি স্বপ্ন বাঁচার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ, যে স্বপ্নের শুরু হয়েছিল মাদেইরার ছোট্ট এক বালকের হাত ধরে, যে কি না একটি ফুটবলের পেছনে ছুটে বেড়াত।
৭ নম্বর জার্সিটি থেকে যাবে। কিন্তু এই জার্সি পরার যে গর্ব, তা চিরকাল আমার হয়ে থাকবে। পর্তুগাল সবসময় আমার হৃদয়ের অংশ হয়ে থাকবে। বিদায়, আবার দেখা হবে।’