
মাঠ পুনরুদ্ধার দাবিতে শেকৃবির শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ, বাণিজ্য মেলার গেট-স্টল ভাঙচুর
মাছুদুর রহমান
প্রকাশ: সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬, ১১:১৮

বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর রহস্য এখনও উদ্ঘাটন হয়নি। তুরাগ নদ থেকে তার মরদেহ উদ্ধারের আগের রাতে টঙ্গীর মাজার বস্তিতে তিন নারীর সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়ান তাহসিফ। সঙ্গে ছিলেন তার বন্ধু দীপ। ওই রাতের আটটি সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণে দেখা যায়, তাহসিফ ও দীপ বস্তির পাশের মাঠে যাওয়ার পর রাত ১টা ৫ মিনিটে সেখানে প্রবেশ করে পুলিশের একটি টহল দল। ১৪ মিনিট পর মাঠ ছেড়ে চলে যায় তারা।
একই সময়ে মাঠ থেকে বস্তিতে ফিরে যান দীপ। আধঘণ্টার বেশি সময় বিভিন্ন গলিতে ঘোরাঘুরির পর রাত ১টা ৫২ মিনিটে তাহসিফকে রেখে চলে যান তিনি। এরইমধ্যে রাত ১টা ৩৫ মিনিটে তাহসিফের ফোন থেকে তার মায়ের কাছে একটি খুদেবার্তা যায়। এই বার্তাটি কে পাঠিয়েছিলেন, তা নিয়েই তৈরি হয়েছে নতুন রহস্য। পুরো ঘটনার সময় ধরে মৃত্যুর রহস্য উন্মোচনের চেষ্টা করছে নৌ-পুলিশ।
গত ২৮ অক্টোবর রাত ১২টা ৩৯ মিনিট। মোটরসাইকেলে টঙ্গীর মাজার বস্তির হোন্ডা রোডে প্রবেশ করেন বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরি। কয়েক সেকেন্ড পর সেখানে আসেন তার জুনিয়র বন্ধু দীপও।
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, হোন্ডা রোডে মোটরসাইকেলটি পার্ক করে গলিপথ ধরে বস্তির পাশ দিয়ে তুরাগ নদের তীরে যান তারা। ওই রাতে মাজার বস্তিতে তাহসিফ ও দীপ কী করেছেন এবং কতক্ষণ সেখানে ছিলেন, তা জানার চেষ্টা করা হয়েছে বিভিন্ন ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে।
রাত ১২টা ৪০ মিনিটে অন্য একটি ক্যামেরায় দেখা যায়, বস্তির অন্ধকার গলিতে ঢোকার চেষ্টা করছেন তাহসিফ। তবে এক নারী তাকে বাধা দেন। এসময় দীপকেও দেখা যায়। অন্য একটি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, তিন নারীর সঙ্গে তর্কে না জড়িয়ে সেখান থেকে চলে আসতে দীপকে বলছেন তাহসিফ। পরে ওই গলি দিয়ে সামনে এগিয়ে বস্তির পাশে তুরাগ নদ-ঘেঁষা মাঠে যান দুজন।
ওই তিন নারীর দাবি, মাদকের আস্তানা সন্দেহে বস্তির ওই অংশটি ভেঙে দিয়েছিল পুলিশ। এ কারণে তাহসিফ ও দীপকে গলিতে প্রবেশ করতে নিষেধ করেছিলেন তারা। এক নারী বলেন, ‘‘তিনি জোর করে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করছিলেন। তখন আমরা তাকে নিষেধ করে বলি, ভেতরে গেলে সমস্যা হতে পারে। কিন্তু তিনি আমাদের কথা শোনেননি। তিনি উল্টো বলেন, ‘আমি ভেতরে যাব, কোনো সমস্যা নেই। আমরা রেড দেব, আপনার কোনো সমস্যা হবে না’ এ কথা বলেই তিনি ভেতরে চলে যান।’’
রাত ১টা ৫ মিনিটে বস্তির পাশের পিংকি গার্মেন্টসের সিসিটিভি ক্যামেরায় দেখা যায়, আট সদস্যের পুলিশের একটি টহল দল মাঠে প্রবেশ করছে। মাজারের পাশের রাস্তা দিয়ে ১৪ মিনিট পর মাঠ ছেড়ে চলে যায় দলটি।
পুলিশ যে গেট দিয়ে মাঠে প্রবেশ করেছিল, সেই গেটের ক্যামেরায় রাত ১টা ১৯ মিনিটে দেখা যায় দীপকে। এরপর বস্তির বিভিন্ন গলিতে ঘোরাঘুরি করতে থাকেন তিনি। আধঘণ্টার বেশি সময় পর রাত ১টা ৫২ মিনিটে তাহসিফকে রেখে বস্তি থেকে চলে যান দীপ। এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, ‘দীপের মাথায় সাদা রঙের একটা হেলমেট ছিল। আমি রানিংয়ে ছিলাম। খেয়াল আছে, একজন আশপাশে ঘোরাঘুরি করতেছে। এটাই দেখছি।’
পুলিশের টহল দল মাঠে প্রবেশের সময় দীপের বক্তব্যের সঙ্গেও সিসিটিভি ফুটেজের একটি যোগসূত্র পাওয়া যাচ্ছে। দীপের দাবি, ওই সময় তারা একটি ভবনের সিঁড়ির নিচে বসেছিলেন। পুলিশকে দেখে সেখান থেকে দৌড়ে তুরাগ নদের ২৯ নম্বর পিলারের কাছে আশ্রয় নেন তারা। জায়গাটি নদীর তীরঘেঁষা।
পুলিশের টহল দল চলে যাওয়ার ১৪ মিনিট পর প্রধান সড়কে আবার দেখা যায় দীপকে। এর ১৬ মিনিট পর, রাত ১টা ৩৫ মিনিটে তাহসিফের ফোন থেকে তার মায়ের কাছে একটি খুদেবার্তা যায়। কিন্তু দীপ যদি তাহসিফকে হারিয়ে ফেলে থাকেন, তাহলে বার্তাটি কে পাঠিয়েছিলেন? মামলার তদন্তে এখন এটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এই বার্তার উৎস ও প্রেরক শনাক্ত করতে পারলে মৃত্যুর রহস্য উদ্ঘাটনে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পাওয়া যেতে পারে।
সেদিন রাতে বস্তির পাশে পুলিশের টহল কেন ছিল, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে। টঙ্গী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুর রহমান বলেন, ‘এটি ছিল নিয়মিত টহলের অংশ। নদীর ওই এলাকায় আগে যারা নিয়মিত আসতেন, তাদের কাউকে কাউকে এখনো বিক্ষিপ্তভাবে দেখা যায়। আমাদের এখানে বাজার ডিউটি দেয়া হয়েছিল। এই টিমও সে ধরনের একটি টিমের অংশ ছিল।’
মামলার তদন্তকারী সংস্থা নৌ-পুলিশ বলছে, বস্তিতে সন্দেহজনক চলাফেরা নিয়ে দীপকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। পাশাপাশি পুলিশের টহল দলের ওই এলাকায় যাওয়ার বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
নৌ-পুলিশের ঢাকা অঞ্চলের পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘দীপ যেসব বক্তব্য দিয়েছেন, সেগুলোর কোন অংশ কতটুকু সত্য, তা আমরা যাচাই-বাছাই করছি। হাতে যেহেতু আরও চার দিন সময় আছে, তাই বাকি কাজগুলো শেষ করে দেখি, কোনো কার্যকর ফল পাওয়া যায় কি না।’
প্রয়োজনে ওই রাতে টহলে অংশ নেয়া পুলিশ সদস্যদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে নৌ-পুলিশ।