
শাহজালালে সৌদিগামী ৬১ ফ্লাইট বাতিল, ভোগান্তিতে ৯২৬৯ যাত্রী
শফিকুজ্জামান রুবেল, ঢাকা
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ৭:৫৩

ঢাকার যানজটে নাজেহাল যাত্রীরা। ছবি সময় সংবাদ
রাজধানীর গণপরিবহনে চলাচল যেন প্রতিদিনের যুদ্ধে পরিণত হয়েছে। গাদাগাদি করে যাত্রী তোলা, বাসের দরজায় ঝুলে থাকা কিংবা দৌড়ে বাসে উঠতে গিয়ে প্রায়ই দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন যাত্রীরা। সামান্য অসতর্কতায় বাসের চাকায় পিষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও থাকে। অথচ নির্ধারিত স্টপেজে বাস থামিয়ে যাত্রী তোলা হলে এমন ঝুঁকি অনেকটাই এড়ানো সম্ভব। কয়েক সেকেন্ড আগে যাত্রী তোলার এই প্রতিযোগিতায় প্রশ্ন উঠছে, যাত্রীদের জীবন ও নিরাপত্তা কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে?
সড়কে আড়াআড়িভাবে বাস থামিয়ে যাত্রী তোলার প্রতিযোগিতায় বাড়ছে যানজটও। এর সঙ্গে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার দখলে সড়কে যান চলাচলের গতি নেমে এসেছে তলানিতে। অথচ একই শহরের হাতিরঝিলে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। সেখানে নির্ধারিত স্টপেজ থেকে নিয়ম মেনে বাসে উঠছেন যাত্রীরা। নেই হুড়োহুড়ি কিংবা আগে যাত্রী তোলার প্রতিযোগিতা।
বিশৃঙ্খল রাজধানীতে সুশৃঙ্খল বাস চলাচলের উদাহরণ হাতিরঝিল। তাহলে একই শহরের সড়কগুলোতে এমন পার্থক্য কেন? সমস্যাগুলো কোথায়, তা চিহ্নিত করে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না কেন?
রাজধানীর গণপরিবহনের এই নাজুক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে আবারও বাস রুট রেশনালাইজেশন বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ছয় মাসের মধ্যে ৩২টি রুট নির্ধারণ করে ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক একটি কোম্পানির অধীনে বাস চলবে। বাস মালিকরা বিনিয়োগের অনুপাতে মুনাফা পাবেন। চালক ও শ্রমিকদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের পরিবর্তে কোম্পানির অধীনে মাসিক বেতনে কাজ করার ব্যবস্থা থাকবে। নির্ধারিত সময় ও স্থান থেকে বাস ছাড়বে এবং যাত্রী ওঠানো-নামানো হবে।
এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে যাত্রীরা বলেন, বাসে আগে যাত্রী তোলার প্রতিযোগিতায় মানুষ হয়রানির শিকার হন, পড়ে যান, দুর্ঘটনাও ঘটে। রেশনালাইজেশন বাস্তবায়ন হলে এ পরিস্থিতি থেকে মুক্তি মিলবে। হাতিরঝিল ও চট্টগ্রামের মতো ব্যবস্থা চালু হলে সব রুটের বাসযাত্রীরা অনেক উপকৃত হবেন।
বাসচালকরাও মনে করছেন, এ ব্যবস্থা চালু হলে সড়কে বাসের মধ্যে প্রতিযোগিতা কমবে। এতে যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমার পাশাপাশি যাত্রীদের ভোগান্তিও কমবে।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে এরইমধ্যে বাস রুট রেশনালাইজেশন বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছে ডিটিসিএ। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে বাস চলাচলের জন্য অনুমোদিত ৪১৮টি রুটের মধ্যে বর্তমানে সচল রয়েছে মাত্র ৯৮টি। এসব রুটে ১২০টি কোম্পানির বাস চলার কথা থাকলেও বাস্তবে চলছে ৬৬টি কোম্পানির বাস। অন্যদিকে, মহানগরীর চার হাজার কিলোমিটার সড়কের মধ্যে বাস চলাচলের উপযোগী মাত্র ৩৯০ কিলোমিটার।
এ পরিস্থিতিতে বাস চলাচলের সড়ক থেকে অটোরিকশাসহ অবৈধ যানবাহন সরানো না গেলে প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব নয় বলে মনে করছে ডিটিসিএ। ডিটিসিএর ডেপুটি ট্রান্সপোর্ট প্ল্যানার ধ্রুব আলম বলেন, ‘৩৯০ কিলোমিটার রাস্তায় আসলে রিকশা চলতে দেয়া যাবে না। বাকি যে ৯০ শতাংশ রাস্তা, সেটা রিকশার জন্য উন্মুক্ত থাক, কোনো সমস্যা নেই। স্টপেজ থাকবে, টিকিট কেটে উঠতে হবে, টিকিট কেটে নামতে হবে। এটার আসলে কোনো বিকল্প নেই।’
সরকারের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে সড়ক পরিবহন মালিক সমিতিও। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. সাইফুল আলম বলেন, ‘যারা এই নির্দেশনা মানবে না, তাদের বিরুদ্ধে আমরা সাংগঠনিকভাবে ব্যবস্থা নিয়ে প্রশাসনকে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করব।’
তবে প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান ও অবকাঠামোর ঘাটতি নিয়ে কাজ শুরু করলে এবারও উদ্যোগটি ব্যর্থ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন পরিবহন বিশেষজ্ঞরা। পরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এম সামছুল হক বলেন, ‘স্টেশনগুলো যেমন সুন্দরভাবে আবেদন সৃষ্টিকারী হতে হবে, তেমনি সড়কে সেগুলোর অগ্রাধিকার থাকতে হবে। টার্মিনালগুলোও থাকতে হবে। এগুলোর ঘাটতি রেখে কাজ শুরু করলে হোঁচট খাওয়ার সম্ভাবনা আছে। পরিকল্পনা সুন্দরভাবে না করে ঘাটারচরের মতো যদি আবারও মুখ থুবড়ে পড়ে, তাহলে বদনামের ভাগীদার হতে হবে।’
ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক বাস পরিচালনা ব্যবস্থা কার্যকর করতে চালকদের পাশাপাশি যাত্রীদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে। এর আগেও একাধিকবার বাস রুট রেশনালাইজেশন বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। মাঝখানে ব্যয় হয়েছে কোটি কোটি টাকা। সমস্যা চিহ্নিত, সমাধানও জানা। তবু বাস্তবায়নের পথে বাধা কোথায়? এবারও কি ভেস্তে যাবে উদ্যোগ, নাকি শেষ পর্যন্ত রাজধানীর সড়কে শৃঙ্খলা ফিরবে; এখন সেটিই দেখার বিষয়।