
দূষণ বেড়েছে ঢাকার বাতাসে
বুলবুল রেজা
প্রকাশ: শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬, ৮:২৬

দালালচক্রের ফাঁদে পড়ে ইতালি যাওয়ার প্রলোভনে এখন লিবিয়ার বন্দিশালায় নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন কিশোরগঞ্জের ভৈরবের কয়েকটি গ্রামের তিন শতাধিক তরুণ। তাদের ইতালি না নিয়ে মুম্বাই, সৌদি আরব ও মিশর ঘুরিয়ে নেয়া হয় লিবিয়ায়। সেখানে দেশীয় দালালচক্র আন্তর্জাতিক মাফিয়াদের কাছে বিক্রি করে দেয় তাদের। এরপর শুরু হয় নির্যাতন। মুক্তির জন্য জনপ্রতি ২৫ লাখ টাকা করে মুক্তিপণ দাবি করছে তারা।
বন্দিশালায় আটকে থাকা স্বজনদের দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী পরিবারগুলো। ব্র্যাকের তথ্য বলছে, এ মুহূর্তে লিবিয়ায় অন্তত ১০ হাজারেরও বেশি মানুষ বন্দি রয়েছেন।
ইতালি যাওয়ার স্বপ্নে বিভোর ভৈরবের শিবপুর ইউনিয়নের বাসিন্দারা। এরইমধ্যে শতাধিক পরিবার নিঃস্ব হয়েছে। জনপ্রতি ২২ লাখ টাকার চুক্তিতে লিবিয়া হয়ে ইতালি পৌঁছে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে দালালচক্র তাদের নিয়ে যায় গেমঘরে। কিন্তু সেখানে গিয়ে বন্দি জীবন, নির্যাতন আর মুক্তিপণের ফাঁদে পড়ছেন তরুণরা। ৫০ লাখ টাকা দিয়েও অনেকের মুক্তি মিলছে না। শেষ পর্যন্ত কারও কারও ফিরতে হচ্ছে লাশ হয়ে।
ঢাকা থেকে মুম্বাই, সেখান থেকে সৌদি আরব। এক সপ্তাহ পর মিশর, এরপর লিবিয়ার বেনগাজি। মাস দুয়েক পর ত্রিপোলি। অবৈধ পথে ইতালি যাওয়ার উদ্দেশ্যে পাঁচ মাস আগে এভাবেই দেশ ছাড়েন ভৈরবের শম্ভুপুর এলাকার পারভেজ। তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে এখন পর্যন্ত পরিবারের খরচ হয়েছে ৫২ লাখ টাকা।
পারভেজের এক স্বজন বলেন, ‘এমনিতে ২০ হাজার, ৪০ হাজার টাকা করে দিয়েছি একেকবার। এর কোনো হিসাব নেই। মাফিয়াদের হাতে যাওয়ার পর দালালরা মোট ৫২ লাখ টাকা নিয়েছে।’
পারভেজের মতো শুধু শম্ভুপুর গ্রামেরই ৩৩ তরুণ লিবিয়ার বিভিন্ন টর্চার সেলে বন্দি রয়েছেন। ট্যুরিস্ট ভিসায় কয়েকটি দেশ ঘুরিয়ে তাদের নেয়া হয় লিবিয়ার ত্রিপোলিতে। সেখানে প্রথম দফায় দালালদের হাতবদল হন তারা। এরপর দ্বিতীয় দফায় আন্তর্জাতিক মাফিয়াদের কাছে বিক্রি করে দেয়া হয়। শুরু হয় শারীরিক নির্যাতন। মুক্তির জন্য জনপ্রতি ২৫ লাখ টাকা করে দাবি করছে মাফিয়ারা।
এক স্বজন বলেন, ‘পারভেজের জন্য চুক্তি ছিল ১৮ লাখ টাকা। প্রথমে ১৮ লাখ টাকা দিয়েছি। পরে আরও ১০ লাখ টাকা দালালকে দেয়া হয়েছে। বাইজিদের জন্য চুক্তি হয়েছিল ১৩ লাখ টাকায়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে দালাল ৯ লাখ টাকার বেশি অতিরিক্ত নিয়েছে। আর হিমেলের জন্য চুক্তি হয়েছিল ২২ লাখ টাকা। তার জন্যও ২২ লাখ টাকা দেয়ার পর আরও প্রায় ১০ লাখ টাকার বেশি নিয়েছে।’
আরেক স্বজন বলেন, ‘‘আমার ছেলে কান্নাকাটি করছে। মারধর করছে। ফোন দিয়ে বলছে, ‘আব্বা, আমাকে মেরে ফেলছে, আমাকে বাঁচাও।’ পরে দালালরা আবার ফোন দিয়ে বলছে, ‘দুদিন পর্যন্ত সময় দিয়েছিলাম। আপনি গরিব মানুষ, আরও দুদিন সময় দিলাম। এরমধ্যে টাকা না দিলে গলা কেটে ফেলব। চার হাত-পাও কেটে ফেলব।’’
প্রভা আক্তারের স্বামী ওমর ফারুকও একই পথে ইতালি যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তাকে ছাড়িয়ে আনতে এখন পর্যন্ত দালালকে দিতে হয়েছে ৪০ লাখ টাকা। প্রভা আক্তার বলেন, ‘নিয়ে যাওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত শুধু টাকাই দিয়ে যাচ্ছি। এই পর্যন্ত আমার চিকিৎসা চলে না, মেয়েকে নিয়ে যে অন্য কোথাও যাব, সেই সামর্থ্যও নেই।’
লিবিয়ার বন্দিশালায় আটকে আছেন মর্জিনা বেগমের একমাত্র ছেলে। তার মুক্তির জন্য ফসলি জমি ও বসতভিটা বিক্রি করেছেন তিনি। নিজের ও মেয়ের স্বর্ণালংকারও আর অবশিষ্ট নেই। মর্জিনা বেগম বলেন, ‘ছেলে বলে, মা বাঁচাও, বাঁচাও। ২৫ লাখ টাকা দিয়ে আমাকে ছাড়িয়ে নাও। এ পর্যন্ত আমার ৪৫ লাখ টাকা গেছে। পরে বাড়ি-ভিটা, আধা ঘর বিক্রি করে দিয়েছি। কারণ, আমার স্বামী নেই, আমাকে টাকা দেয়ারও কেউ নেই।’
শিবপুর ইউনিয়নের রুবি আক্তারের ছেলেও বন্দি রয়েছেন লিবিয়ায়। দেশে রুবির স্বামীর জুতার ব্যবসা রয়েছে। ছেলের মুক্তির প্রতিশ্রুতি দিয়ে দালাল ৬ হাজার জোড়া জুতা বানিয়ে নেয়, যার বাজারমূল্য ২০ লাখ টাকার বেশি। এর আগে আরও ২২ লাখ টাকা নিয়েছে চক্রটি। রুবি আক্তার বলেন, ‘এই কাজটা আমি বাধ্য হয়ে কর্মচারী দিয়ে করিয়েছি। এই পণ্যগুলো দেড়-দুই মাসের মধ্যে তৈরি করে দিয়েছি।’
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, রাজন নামে স্থানীয় এক দালাল ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যে ইতালি পৌঁছে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। জনপ্রতি ২২ লাখ টাকা চুক্তি করে সেই অর্থ রাজনের চাচা আরিফের হাতে তুলে দেন তারা। কিন্তু গত কয়েক মাস ধরে রাজনের বাড়ি তালাবদ্ধ। উধাও তার চাচাও
উৎস চন্দ্র নামে এই চক্রের আরেক হোতা লিবিয়ায় বসে পুরো সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করেন বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। এক স্বজন বলেন, ‘দাললরা বলছে ২৫ লাখ টাকা দিলে মারধর বন্ধ করবে। টাকা দেন, টাকা না দিলে মেরে ফেলবে। ১০ দিনে দুবার লাঠি দিয়ে মেরেছে। ভিডিও ফুটেজ আছে। পিঠের অবস্থা, ত্বকের অবস্থা খুবই খারাপ। ২৫ লাখ টাকা করে দিতে হবে, না হলে লোক ফেরত দেবে না, মেরে ফেলবে। তাদের চেহারা দেখার মতো অবস্থায় নেই। অনেকের কাছ থেকে দাবি করা টাকা নেয়ার পরও ছাড়েনি। কেউ ৪০ লাখ টাকা দেয়ার পর আরও ২৫ লাখ টাকা দিয়ে মোট ৬৫ লাখ টাকা দিয়ে মুক্তি পেয়েছে। এরপরও অনেকে মুক্তি পায়নি।’
সম্প্রতি লিবিয়ার টর্চার সেল থেকে মুক্ত হয়ে দেশে ফেরা এ এলাকার দুই যুবকের সঙ্গে কথা হয় সময় সংবাদের। তারা বর্ণনা দেন নির্যাতনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। তাদের একজন বলেন, ‘আমাদের বিক্রি করে দিয়েছিল। ৩২ জনকে মাফিয়াদের কাছে বিক্রি করার পর ব্ল্যাকমেইল করে মারধর করত। উলঙ্গ করে মারত। চিৎকার করে বলতাম, আম্মা, আমাকে বাঁচাও।
আরেক জন বলেন,’বিদেশে নেয়ার আগেই আমাকে মাফিয়াদের কাছে বিক্রি করে দিয়েছিল। অনেক মারধর করেছে। পিস্তলের বাঁট দিয়ে বুকে আঘাত করেছে। মারধরের পর ডলার, জাহাজের কাগজপত্র, পাসপোর্ট-সবকিছু নিয়ে গেছে।’
ইউরোপের সীমান্তরক্ষী বাহিনীগুলোর সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকা ফ্রন্টেক্সের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকেই সবচেয়ে বেশি মানুষ লিবিয়া হয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি যাওয়ার চেষ্টা করেন। ২০০৯ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এই অবৈধ পথে ১ লাখ ১০ হাজার বাংলাদেশি ইউরোপে প্রবেশ করেছেন।
ব্র্যাক মাইগ্রেশনের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বলেন, ‘পরিবারগুলো যখন তাদের পাঠায়, তখন কিন্তু কারও সঙ্গে কথা বলে না। তারা সেখানে গিয়ে নির্যাতন বা গ্রেফতারের শিকার হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কিংবা আমাদের কাছে আসে। শুধু ঘটনা ঘটার পর স্থানীয় দালালচক্রকে ধরলেই হবে না। কারণ, তাদের অর্থের লেনদেন কোথায় হচ্ছে? লিবিয়ায় আটকে রেখে যে টাকা নেয়া হচ্ছে, সেই টাকা কোথায় যাচ্ছে? সেটি খুঁজে বের করতে হবে। এটি একটি সংঘবদ্ধ অপরাধ। তাই পুরো অপরাধচক্রকে ধরতে হবে।’
বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের তথ্য বলছে, দেশের ১০টি জেলার মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অবৈধ পথে ইতালি যাওয়ার চেষ্টা করছেন। এর মধ্যে অন্যতম কিশোরগঞ্জ।